
নওগাঁ জেলার একটি গ্রামের সাধারণ গৃহবধূ রাহেলা বেগম (৬৫) আজ (১৯ জানুয়ারি, ২০২৬) দীর্ঘ ৩০ বছরের কারাবাস শেষে মুক্তি পেয়েছেন। ১৯৯৬ সালে একটি ছোটখাটো অপরাধের (চুরির অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা) দায়ে আদালত তাঁকে সামান্য ৫,৫০০ টাকা অর্থদণ্ডসহ কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সদস্য হওয়ায় তিনি এই জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। ফলে আইন অনুযায়ী অনাদায়ে অতিরিক্ত কারাদণ্ডের বিধানের কারণে তাঁর সাজা দীর্ঘায়িত হয়ে যায় এবং তিনি ৩০ বছর ধরে নওগাঁ জেলা কারাগারে বন্দি ছিলেন।
যখন রাহেলা বেগম কারাগারে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৫ বছর। চুলে তখনো পাক ধরেনি, জীবনের অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আজ মুক্তির দিনে তিনি বেরিয়েছেন ৬৫ বছর বয়সে—জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টা কারাগারের অন্ধকার চার দেয়ালের মধ্যে কাটিয়ে। পরিবারের সদস্যরা জানান, এত বছরে তাঁর স্বামী মারা গেছেন, সন্তানরা বড় হয়েছে, নাতি-নাতনিরা জন্মেছে—কিন্তু মা/দাদির সঙ্গে সেই স্নেহের বন্ধন গড়ে ওঠেনি।
এই ঘটনা নিয়ে সমাজে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে বলছেন, এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা ও আইনের শাসনের এক করুণ দৃষ্টান্ত। গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য আইন কঠোর হলেও ধনী-প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সহজ হয়ে যায়। ৫,৫০০ টাকার মতো সামান্য অঙ্কের জরিমানার জন্য একজন মানুষের পুরো জীবন নষ্ট হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
কারামুক্তির পর রাহেলা বেগমের চোখে আনন্দের অশ্রু। তিনি বলেন, “আমি শুধু বাইরের আলো দেখতে চাই, পরিবারের কাছে ফিরতে চাই। এত বছরের কষ্ট ভুলে যেতে চাই।” তবে তাঁর মুক্তি অনেকের মনে প্রশ্ন তুলেছে—আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান? গরিবের জন্য কি এই ‘আইনের শাসন’ আরও নির্মম হয়ে ওঠে?
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেকে দাবি করছেন যে, অনাদায়ে অতিরিক্ত কারাদণ্ডের বিধান পুনর্বিবেচনা করা উচিত, বিশেষ করে ছোট অপরাধের ক্ষেত্রে। রাহেলা বেগমের মুক্তি একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনি সমাজের জন্য একটি দুঃখজনক স্মারকও বটে।