বিশেষ প্রতিবেদন:
সময় বদলেছে, ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে পরিবর্তন এসেছে রাজনীতির মঞ্চেও। কিন্তু বদলায়নি একটি দিন, আর মেটেনি এক দরদি হৃদয়ের বিচার পাওয়ার আকুলতা। ২০১২ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর—একটি ভুয়া ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উগ্র হিংস্রতার যে আগুনে পুড়েছিল কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, টেকনাফ এবং চট্টগ্রামের বৌদ্ধ বিহার ও পল্লীগুলো, দেখতে দেখতে সেই ভয়াবহ ঘটনার ১৪টি বছর পার হয়ে গেল। আজও প্রতিটি বার্ষিকীতে সেই স্মৃতি মনে করে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের বড়ুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ।
ঘটনার শুরু ২৯শে সেপ্টেম্বর রাতে। হঠাৎ গুজবের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। মুহূর্তের মধ্যে শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ পল্লীগুলোর ওপর নেমে আসে তাণ্ডব। শতাব্দী প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি, দুর্লভ তালপাতার পুঁথি, পবিত্র প্যাগোডা আর বসতবাড়িগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয় নিমেষেই। রাতারাতি ছাইয়ে পরিণত হয় হাজার বছরের কৃষ্টি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অমূল্য ঐতিহ্য। রামুর লালচিং, সাদাচ্ছায়ার শান্ত প্রাঙ্গণ সেদিন পরিণত হয়েছিল নারকীয় ধ্বংসস্তূপে।
পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকার ক্ষতিগ্রস্ত বিহারগুলো পুনর্নির্মাণ করে দিয়েছিল বটে, তবে ক্ষতে প্রলেপ পড়লেও মন থেকে মুছে যায়নি সেই আতঙ্কের দাগ। কিন্তু দীর্ঘ ১৪ বছরে বড়ুয়াদের মূল যে দাবি—প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি—তা অধরাই রয়ে গেছে।
হামলার পর রামু, উখিয়া ও টেকনাফে দায়ের করা হয়েছিল প্রায় ডজনখানেক মামলা। অভিযোগপত্রে শত শত মানুষকে আসামি করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো মামলার আসামির বিচার কিংবা চূড়ান্ত রায় কার্যকর হয়নি। আইনের ফাঁকগললে অনেকেই পার পেয়ে গেছেন, কেউ কেউ প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সময় গড়িয়েছে, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতা রদবদল হয়েছে, তবে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সেই রক্তক্ষরণ ও বিচার পাওয়ার অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
”ইট-পাথরের বিহার হয়তো আবার তৈরি হয়েছে, কিন্তু আমাদের বুকের ভেতরের বিশ্বাস আর নিরাপত্তার যে দেয়াল সেদিন ভেঙেছিল, তা কি আর ফিরে এসেছে?”— রামুর এক প্রবীণ বৌদ্ধ অধিবাসীর এই আকুতি আজও বাতাস ভারি করে তোলে।
১৪টি বছর পেরিয়ে এসে প্রশ্ন থেকেই যায়—আর কতকাল জাস্টিসের এই চাকা থমকে থাকবে? রাজনীতির হিসাব-নিকাশ আর দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে বন্দি রামুর এই ক্ষত কি আদৌ কখনো শুকাবে, নাকি বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই বয়ে বেড়াতে হবে আগামী প্রজন্মকেও?