কূটনৈতিক টানাপোড়েন, কঠোর আইনি বাধা এবং দলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে বছরের শেষভাগে তার প্রত্যাবর্তনের বার্তা ছড়ানো হলেও, বাস্তব পরিস্থিতির কারণে এটি এখন স্রেফ ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
দিল্লির ওপর ঢাকার কূটনৈতিক চাপ
ঢাকার নীতিনির্ধারণী মহল ভারতের কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্যমতে, শেখ হাসিনাকে ভারত রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে কি না—তা দিল্লির নিজস্ব বিষয় হলেও, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তিনি যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও স্থিতিশীলতায় কোনো হস্তক্ষেপ করতে না পারেন, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চাইছে সরকার।
এই কূটনৈতিক অস্বস্তি প্রভাব ফেলছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে দিল্লির আগামী দিনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের নতুন গতি নির্ধারণে ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ এখন অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে এসেছে। দিল্লি যদি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধি-নিষেধ আরোপ করে, তবে কার্যত তার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা আরও দূরূহ হয়ে পড়বে।
যেসব কারণে ফেরা অনিশ্চিত
আইনি জটিলতা ও দণ্ডাদেশ: জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে তার বিরুদ্ধে চরম দণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দেশে পা রাখামাত্রই তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে; রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার সুযোগ আইনত নেই।
প্রত্যর্পণ চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকলেও, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে দিল্লির কূটনৈতিক বিবেচনা এবং তাদের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। অল্প সময়ে এ প্রক্রিয়ার সমাধান হওয়া অসম্ভব।
দলীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতি: ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব কারাগারে, আত্মগোপনে বা বিদেশে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা নানা সংকটে জর্জরিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে বরণ বা সুরক্ষা দেওয়ার মতো সুসংগঠিত সাংগঠনিক সক্ষমতা দলটির বর্তমানে নেই।
নিরাপত্তা ও জনরোষের ঝুঁকি: অভ্যুত্থান-পরবর্তী গণক্ষোভ এখনো মিলিয়ে যায়নি। তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে বড় ধরনের সংঘাত, সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে।
আওয়ামী লীগের দ্বিধাদ্বন্দ্ব
প্রবাসী কেন্দ্রীয় নেতাদের একাংশের মতে, শেখ হাসিনা ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও পরিস্থিতি এখন আর তার একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। ফলে ডিসেম্বরে তিনি না ফিরলে নেতাকর্মীদের হতাশা কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে, তা নিয়ে দলে অস্বস্তি বাড়ছে।
অন্যদিকে, দলের একটি কট্টরপন্থী অংশ মনে করছে—বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যের কারণে সৃষ্ট জনঅসন্তোষ বড় আকার নিলে শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই হিসাব একেবারেই অবাস্তব।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুতির পরপরই রাজনীতি থেকে দূরে থাকার যে বার্তা তৎকালীন সময়ে পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান ফেরার ঘোষণা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি মূলত নেতাকর্মীদের ধরে রাখার একটি মৌখিক আশ্বাস মাত্র। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অল্প সময়ের মধ্যে তার দেশে ফেরার কোনো দৃশ্যমান সম্ভাবনা নেই।