নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। জেলার বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় সাড়ে ৭ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী ও ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরকারি ত্রাণ সহায়তার চরম অপ্রতুলতা এবং বিতরণে ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে।
দুর্গতদের দাবি, বন্যার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পায়নি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের মোট ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিপুল সংখ্যক এই জনগোষ্ঠীর বিপরীতে এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৬৫ লাখ টাকাসহ মোট ৮৫ লাখ টাকা এবং ৭০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সোমবার দুপুর পর্যন্ত ৭০ লাখ টাকার শুকনো খাবার ও ৬১০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
হিসাব কষে দেখা গেছে, এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে দৈনিক বরাদ্দ মাত্র ১০ লাখ ৬২ হাজার টাকা, যা মাথাপিছু হিসাব করলে দাঁড়ায় মাত্র ১১ টাকা ৬২ পয়সা।
মাঠপর্যায়ের চিত্র ও দুর্গতদের ক্ষোভ:
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম বাঁশখালীর কাথরিয়া, কাঞ্চনাবাদ, বাহারছড়া, সরল, সনুয়া ও শেখেরখীল ইউনিয়ন। এসব এলাকায় কাঁচা ও মাটির ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। বাধ্য হয়ে অনেকে খালের পানি ব্যবহার করছেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কাথরিয়া ইউনিয়নের মধ্যম মানিক পাঠার এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আনসার (৫৫) জানান, পরিবারের ১০ সদস্য নিয়ে তিনি পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দী। তার ঘর ও গুদাম তলিয়ে যাওয়ায় চাচার বাড়ির সিঁড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা পেয়েছি।” একই ইউনিয়নের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন আযাদ অভিযোগ করেন, ত্রাণ বিতরণে বৈষম্য ও সরকারি উদাসীনতার কারণে অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
দুর্গতদের মতে, রান্নার পরিবেশ না থাকায় এই মুহূর্তে চালের চেয়ে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। অথচ সরকারিভাবে মাথাপিছু মাত্র ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাজে আসছে না।
প্রশাসনের ধীরগতি ও নাগরিক সমাজের উদ্বেগ:
গত ৫ জুলাই থেকে ভারী বৃষ্টি এবং ৭ জুলাই থেকে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হলেও সপ্তাহ শেষের আগে দৃশ্যমান কোনো সরকারি তৎপরতা দেখা যায়নি বলে সমালোচকরা দাবি করেছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “সমস্যা সম্পদের ঘাটতি নয়; বরং দুর্বল প্রস্তুতি, সমন্বয়ের অভাব ও জবাবদিহির সংকট। আগাম আবহাওয়া পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ত্রাণ পৌঁছালে তার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।”
স্থানীয় সাংবাদিক রহিম সৈকত অভিযোগ করেন, দুর্গম এলাকাগুলোকে উপেক্ষা করে সহজে যোগাযোগ করা যায় এমন এলাকাগুলোতে আগে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। এমনকি শুরুতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কাথারিয়া ইউনিয়নে কোনো সরকারি বরাদ্দই দেওয়া হয়নি।
একই চিত্র দেখা গেছে পাশের সাতকানিয়া উপজেলাতেও। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বেড়ে সেখানে ১১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে এবং প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানকার বাসিন্দাদেরও একই অভিযোগ—যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার অজুহাতে অনেক পরিবার এখনো ত্রাণ পায়নি।
যা বলছে প্রশাসন ও সেচ্ছাসেবীরা
সরকারি ত্রাণ পৌঁছানোর আগেই দুর্গম এলাকায় রান্না করা খাবার ও পানি নিয়ে পৌঁছেছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। স্বেচ্ছাসেবী বোরহান উদ্দিন জানান, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা ও পুঁইছড়ির বাসিন্দারা তাদের জানিয়েছেন যে তাদের দেওয়া খাবারই ছিল প্রথম ত্রাণ সহায়তা।
অভিযোগের জবাবে কাথারিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সঞ্জিত চন্দ্র সরকার জানান, সোমবার ২৫০টি পরিবারকে চাল দেওয়া হয়েছে এবং তালিকা চূড়ান্ত হলে আরও ৪০০ পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হবে।
বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, “প্রাথমিক বরাদ্দ সীমিত থাকায় একই সঙ্গে সব এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত ত্রাণ আসার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ টন চাল ও ১০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।”
প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, দুর্যোগের শুরু থেকেই সরকারি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। যেসব এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি, সেগুলোর তথ্য প্রশাসনকে জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।