কক্সবাজার প্রতিনিধি:
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সিজারিয়ান অপারেশনের (সিজার) প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর একশ্রেণীর গাইনী ডাক্তারের বাণিজ্যিক মানসিকতা এবং ভুল পরামর্শের কারণে গর্ভবতী মায়েরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই ‘সিজারের ফাঁদে’ পা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তিভোগী পরিবার ও সচেতন মহলের মতে, নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ থাকার পরও অনেক ডাক্তার ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ কৌশলে গর্ভবতী ও তাদের স্বজনদের মনে ভয়ভীতি তৈরি করছে। ফলে নিরুপায় হয়ে দম্পতিরা সিজারের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা পরবর্তীতে মায়ের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতা এবং পরিবারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।
ভয় দেখিয়ে সিজারে বাধ্য করার অভিযোগ
কক্সবাজারের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রসব বেদনা নিয়ে কোনো মা হাসপাতালে ভর্তি হলেই শুরু হয় এক ধরণের কৃত্রিম সংকট।
বাণিজ্যিক মানসিকতা: নরমাল ডেলিভারির তুলনায় সিজারে ক্লিনিকগুলোর কেবিন ভাড়া, ওটি (OT) চার্জ এবং ডাক্তারের ফি বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
ভয়ভীতি প্রদর্শন: “বাচ্চার গলায় নাড়ি পেঁচিয়ে গেছে”, “জরায়ুর পানি শুকিয়ে গেছে” কিংবা “দেরি করলে বাচ্চার ক্ষতি হবে”—এমন নানা অজুহাত বা ভয় দেখিয়ে পরিবারকে দ্রুত ওটি-তে যেতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ সাধারণ মানুষের।
সময়ের অজুহাত: অনেক সময় ডাক্তাররা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার ঝামেলা এড়াতে এবং নিজেদের সময় বাঁচাতে সিজার করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, একটি দেশে মোট প্রসবের মাত্র ১০% থেকে ১৫% সিজারিয়ান হওয়া যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু কক্সবাজারের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই হার প্রায় ৮০% থেকে ৯০% ছুঁয়েছে। এমনকি অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা দরিদ্র পরিবারও এই বাণিজ্যিক ফাঁদের শিকার হচ্ছে। জমি বন্ধক রেখে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ক্লিনিকের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারকে।
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ
শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সম্প্রতি সন্তান জন্ম দেওয়া এক মায়ের স্বামী জানান:
”ডাক্তার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বলেছিলেন সব ঠিক আছে, নরমাল হবে। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তির পরপরই ডিউটি ডাক্তার এসে বললেন—বাচ্চার হার্টবিট কমে যাচ্ছে, এখনই সিজার না করলে বাচ্চাকে বাঁচানো যাবে না। ভয়ে আমরা রাজি হয়ে গেলাম। অথচ পরে বুঝলাম, সেটা শুধু টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল ছিল।”
বিশেষজ্ঞ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অপ্রয়োজনীয় সিজারের কারণে মায়েরা জরায়ু সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং পরবর্তী pregnancies-এ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েন। নবজাতকদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলক কম হতে পারে।
কক্সবাজারের সচেতন নাগরিক সমাজ দাবি জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বেসরকারি হাসপাতাল ও গাইনী ডাক্তারদের এই “সিজার বাণিজ্যের” ওপর কঠোর নজরদারি চালানো উচিত। প্রতিটি হাসপাতালে নরমাল ও সিজারিয়ান ডেলিভারির একটি সঠিক অডিট বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে, মাতৃত্বের এই স্বাভাবিক আনন্দধারা চিরতরে ব্যবসায়িক ফাঁদে বন্দি হয়ে থাকবে।