দিদারুল আলম জিসান: কক্সবাজার
কক্সবাজারের উখিয়ায় বন বিভাগের বিশেষ অভিযানে ৯টি জীবিত বকসহ এক বক শিকারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার (১৩ অক্টোবর) ভোরে উপজেলার মাছকারিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে শিকার করা ৯টি জীবিত বক উদ্ধার করেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন উখিয়া রেঞ্জের উখিয়া সদর বিটের বন কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। বন্য পাখি শিকার ও নিধনের বিরুদ্ধে বন বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ অভিযান চালানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সোমবার ভোরে মাছকারিয়া এলাকায় বক শিকারের খবরের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করেন বন কর্মকর্তারা। অভিযানের একপর্যায়ে বক শিকারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে তার কাছ থেকে ৯টি জীবিত বক উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া পাখিগুলো জীবিত অবস্থায় পাওয়ায় সেগুলো সংরক্ষণ ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম-পরিচয়, তার বাড়ি কোথায় এবং কী পদ্ধতিতে বকগুলো শিকার করা হয়েছিল, সে সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে উদ্ধার করা বকগুলোকে কোথায় রাখা হয়েছে এবং সেগুলোকে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়েছে কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বন্য পাখি শিকার নিয়ে উদ্বেগ
প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন্য পাখির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জলাভূমি, কৃষিজমি, খাল-বিল ও উন্মুক্ত প্রান্তরে বিচরণকারী বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পরিবেশের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বকজাতীয় পাখি জলজ পরিবেশ ও কৃষিজমিতে বিচরণ করে বিভিন্ন ধরনের ছোট জলজ প্রাণী ও পোকামাকড় খেয়ে থাকে। ফলে এসব পাখির নির্বিচার শিকার পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
উখিয়া ও আশপাশের এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশ, বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। জনবসতি বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক আবাসস্থলের পরিবর্তন এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র রক্ষা করা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় বন্য পাখি শিকার প্রতিরোধে বন বিভাগের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে জীবিত পাখি শিকার করে আটক বা বিক্রির উদ্দেশ্যে পরিবহন করা হলে তা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য উদ্বেগজনক। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে শুধু অভিযান পরিচালনাই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা।
আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। তবে তার বিরুদ্ধে কোন ধারায় মামলা বা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
বন্যপ্রাণী শিকার, ধরা, দখলে রাখা কিংবা অবৈধভাবে পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, উদ্ধার করা পাখির ধরন এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতেই আইনগত বিষয়গুলো নির্ধারিত হবে।
এদিকে অভিযানের পর উদ্ধার হওয়া ৯টি বকের পরবর্তী ব্যবস্থা কী হবে, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পাখিগুলো সুস্থ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেগুলোকে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
নজরদারি জোরদারের দাবি
স্থানীয় পর্যায়ে বন্য পাখি শিকার ও বন্যপ্রাণী নিধন প্রতিরোধে বন বিভাগের নিয়মিত টহল, তথ্যভিত্তিক অভিযান এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বন্য পাখি শিকার, বিক্রি বা পরিবহনের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তা শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
মাছকারিয়া এলাকায় বন বিভাগের এ অভিযান বন্য পাখি শিকার প্রতিরোধে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এ ধরনের অপরাধের প্রকৃত চিত্র, শিকারের উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা জানতে তদন্তের বিস্তারিত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জের কর্মকর্তারা অভিযানটি পরিচালনা করলেও এ বিষয়ে তাঁদের বিস্তারিত বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তার ব্যক্তির পরিচয়, উদ্ধার হওয়া বকগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনার আরও তথ্য জানা যাবে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে বন্য পাখি শিকার ও নিধন কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।