
কক্সবাজার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬: বর্তমানে বঙ্গ বা বাঙালি জাতির উৎপত্তি নিয়ে নানা অপব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকে দাবি করেন, বাঙালির ইতিহাস শুরু হয়েছে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দের পর মুসলিম শাসনামলে। কিন্তু প্রাচীন গ্রন্থসমূহ এই দাবির বিপরীতে স্পষ্ট প্রমাণ দেয় যে, বঙ্গের অস্তিত্ব ভারতবর্ষে মুসলিম আগমনের বহু আগে থেকেই ছিল।
মহাভারতসহ প্রাচীন পুরাণে বর্ণিত কাহিনি অনুসারে, রাজা বলির সহধর্মিণী মহারাণী সুদেষ্ণা ছিলেন বঙ্গসহ পাঁচটি প্রাচীন জনপদের আদি জননী। মহর্ষি দীর্ঘতমার আশীর্বাদে সুদেষ্ণার গর্ভে সূর্যের ন্যায় তেজস্বী পাঁচ পুত্রের জন্ম হয়— অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র এবং সুহ্ম। এই পুত্রদের নাম অনুসারেই ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পাঁচটি জনপদ গড়ে ওঠে এবং তাদের নামে খ্যাত হয়।
মহাভারতে উল্লেখ আছে, দীর্ঘতমা মুনি সুদেষ্ণাকে স্পর্শ করে বলেন, “হে দেবি! আপনার গর্ভে সূর্যতুল্য পাঁচ তেজস্বী পুত্র জন্মগ্রহণ করবে। তাদের নাম হবে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম। আর তাদের অধিকৃত দেশগুলোও তাদের নামেই বিখ্যাত হবে।” এই পঞ্চপুত্রের জননী হিসেবে মহারাণী সুদেষ্ণাকে বঙ্গের আদি জননী বা ‘বঙ্গজননী’ বলে অভিহিত করা হয়। বিশেষ করে বঙ্গ জনপদটি এই পাঁচের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল।
বৈদিক যুগে বঙ্গের উল্লেখ:
ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ প্রসঙ্গে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। বেদের যুগ থেকেই এই অঞ্চলের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে, যদিও তৎকালীন ভাষা বর্তমান বাংলার মতো ছিল না। ভাষা তার নিজস্ব গতিতে পরিবর্তিত হয়েছে।
রামায়ণে বঙ্গদেশ:
রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডে রাজা দশরথ কৈকেয়ীকে তাঁর সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ দেশসমূহের তালিকায় বঙ্গদেশের নাম উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “দ্রাবিড়দেশ, সিন্ধু-সৌবীর, সৌরাষ্ট্র, দক্ষিণাপথ, বঙ্গদেশ, অঙ্গদেশ, মগধ, মৎস্যদেশ, কাশি, কোশল— এসব সমৃদ্ধ দেশ আমার অধীন।”
বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই এই প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞাত। তাই বঙ্গের আদি জননী মহারাণী সুদেষ্ণা এবং পঞ্চজনপদের উৎপত্তিকথা উত্তর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা একান্ত কর্তব্য বলে মনে করেন ইতিহাসপ্রেমীরা। এই কাহিনি শুধু পৌরাণিক নয়, বরং বাঙালি জাতির হাজার হাজার বছরের প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য বহন করে।