ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মানেই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য উৎসব। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা পশু কোরবানি করে থাকেন। তবে কোরবানি কেবল পশু জবাইয়ের সাধারণ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মনের পশুবৃত্তি ও অহংকার দূর করে তাকওয়া অর্জনের একটি মাধ্যম।
ইসলামী শরিয়তে কোরবানির পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্তাবলি রয়েছে। পশুর শরীরে বিশেষ কিছু ত্রুটি থাকলে সেই কোরবানি ইসলামী বিধান অনুযায়ী বাতিল বলে গণ্য হবে।
কাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব?
ইসলামী আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এবং ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। কারো কাছে যদি সাড়ে সাত ভরি সোনা, সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এর সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা ব্যবসায়ী মূলধন থাকে, তবে তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি আদায় করতে হবে।
পবিত্র কোরআনের সুরা হজ এবং সুরা কাওসারে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আবু দাউদ শরিফের হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন যে সামর্থ্যবান প্রতিটি পরিবারের ওপর প্রতি বছর কোরবানি করা আবশ্যক। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, ঈদের দিন সকালে প্রথমে ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে এবং এরপরই পশু জবাই করা নবীজির (সা.) সুন্নাত।
যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি শুদ্ধ হবে না
শরিয়ত অনুযায়ী, কোরবানির পশুকে অবশ্যই সুস্থ, সবল এবং সম্পূর্ণ রোগমুক্ত হতে হবে। হাট থেকে পশু কেনার সময় ক্রেতাদের নিচের বিষয়গুলো গভীরভাবে খেয়াল রাখতে হবে:
অন্ধত্ব: পশুর চোখ অন্ধ বা দৃষ্টিশক্তিতে মারাত্মক ত্রুটি থাকলে সেই পশু দিয়ে কোরবানি হবে না।
শারীরিক অক্ষমতা: পশু যদি স্পষ্ট খোঁড়া হয়, অর্থাৎ জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার সক্ষমতা না থাকে, তবে তা কোরবানির অযোগ্য।
অঙ্গহানি: পশুর কান কাটা বা শিং গোড়া থেকে ভাঙা থাকলে কোরবানি আদায় হবে না।
চরম দুর্বলতা: হাড্ডিসার, চরম রুগ্ন ও দুর্বল পশু কোরবানির জন্য নির্বাচন করা শরিয়তসম্মত নয়।
কেমন পশু নির্বাচন করা উত্তম?
ত্রুটিমুক্ত, মোটাতাজা, শিংযুক্ত এবং দেখতে সুন্দর পশু কোরবানি করা উত্তম। নবী করিম (সা.) সব সময় উৎকৃষ্ট ও দৃষ্টিনন্দন পশু কোরবানি করতে পছন্দ করতেন।
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে শিংবিশিষ্ট এমন একটি নিখুঁত দুম্বা কোরবানির জন্য নির্বাচন করেছিলেন, যার চোখ, পেট এবং পায়ের দিকের অংশ কালো রঙের ছিল। ধারালো ছুরি দিয়ে তিনি নিজ হাতে পশুটি জবাই করে উম্মতের জন্য আদর্শ স্থাপন করে গেছেন।
কোরবানির মূল উদ্দেশ্য গোশত সংগ্রহ নয়; বরং আল্লাহর প্রতি অগাধ প্রেম ও নিজের তাকওয়ার প্রমাণ দেওয়া। তাই হালাল উপার্জনের অর্থে একটি নিখুঁত ও সুন্দর পশু নির্বাচনের মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্ন করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের কর্তব্য।