বিশেষ প্রতিবেদন:
বাংলাদেশে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর জনমনে সবচেয়ে বড় স্বস্তি আসার কথা থাকলেও, একটি পুরনো ও পরিচিত আতঙ্ক নতুন করে সাধারণ মানুষকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সেটি হলো—"রাজনৈতিক ট্যাগিং" বা তকমা দিয়ে মামলা, হামলা ও হয়রানি করার সংস্কৃতি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী মত দমনে যেভাবে দেদারসে ‘শিবির’ বা ‘বিএনপি’ তকমা ব্যবহার করা হতো, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে সেই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি না—তা নিয়ে জনসাধারণের মনে গভীর সংশয় ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ট্যাগিং সংস্কৃতির অতীত রূপ
বিগত দেড় দশকে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ‘ট্যাগিং’ ছিল ভিন্নমত দমনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
‘শিবির’ ও ‘জঙ্গি’ কার্ড: সাধারণ শিক্ষার্থী, চাকুরীপ্রার্থী বা কোনো নাগরিক সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেই তাকে মুহূর্তের মধ্যে ‘শিবির’ বা ‘জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতো।
মামলা ও হয়রানি: এই তকমা ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা দেওয়া হয়েছে, রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং ক্যারিয়ার ধ্বংস করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বড় অংশকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে ব্যবহার করার এই সংস্কৃতি জনমনে স্থায়ী ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও নতুন আশঙ্কা
৫ই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর দেশের মানুষ একটি বৈষম্যহীন ও স্বাধীন পরিবেশের প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঢালাও মামলা, ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যবসায়িক শত্রুতার জেরে ‘আওয়ামী লীগ’ বা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে হয়রানি করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জনসাধারণের মনে এখন প্রধান প্রশ্ন দুটি:
১. কতদিন চলবে এই মামলা-হামলার খেলা?
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এই চক্র থেকে দেশ কি আদেও বের হতে পারবে, নাকি কেবল ক্ষমতার হাতবদলের সাথে সাথে ভুক্তভোগীর তালিকাটাই বদলে যাবে?
২. বিএনপি-জামায়াত কি একই পথে হাঁটবে?
আওয়ামী লীগ যেভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছিল, বর্তমানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলো (যেমন বিএনপি বা জামায়াত-শিবির) কিংবা তাদের নাম ভাঙিয়ে কোনো মহল কি নিজস্ব স্বার্থ বা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য একই পথ বেছে নেবে?
জনসাধারণ ও বিশ্লেষকদের মতামত
সাধারণ মানুষের মতে, যেকোনো অপরাধীর বিচার দেশের প্রচলিত আইনে হওয়া উচিত, কোনো রাজনৈতিক তকমা দিয়ে নয়। ঢালাওভাবে মামলা ও হয়রানি করলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে আবডালে পার পেয়ে যায়, আর বলির পাঁঠা হয় সাধারণ মানুষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে:
যদি নতুন বাংলাদেশেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে 'ট্যাগিং' ও ঢালাও মামলার সংস্কৃতি চালু থাকে, তবে তা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিটকে ক্ষুণ্ণ করবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক দলের পরিচয় নির্বিশেষে সব ধরনের প্রতিহিংসামূলক হয়রানি বন্ধ করতে হবে। নতুবা পুরনো ফ্যাসিবাদের রূপান্তর ঘটবে নতুন নামে।